ভূমিকা
মানুষ ভুল-ত্রুটির বাইরে নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং নেক আমল করতে নির্দেশ দিয়েছেন, যা গুনাহ মাফের মাধ্যম হয়। হাদিসে এমন অনেক আমলের উল্লেখ আছে, যা করলে আল্লাহ গুনাহ মাফ করেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। আজ আমরা সহিহ হাদিসের আলোকে যেসব আমল গুনাহ মাফ করে এমন 20 টি বিশেষ আমল নিয়ে আলোচনা করব।
১. বারবার হজ ও ওমরাহ – দারিদ্র্য ও গুনাহ মোচনকারী আমলনবী ﷺ বলেছেন:
“তোমরা একের পর এক হজ-ওমরাহ করো, কারণ তা দারিদ্র্য ও গুনাহ এমনভাবে মুছে দেয়, যেমন কামারের হাপর লোহা-সোনার ময়লা দূর করে।”
(তিরমিযী ৮১০)
ফজিলত
- দারিদ্র্য দূর করে
- পূর্বের গুনাহ মুছে দেয়
- জান্নাতের সুসংবাদ
২. তাহিয়্যাতুল ওযু – ওযুর পর ২ রাকাত নামাজ
রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যে সুন্দরভাবে ওযু করবে, তারপর দুই রাকাত নামাজ পড়বে—যেখানে দুনিয়ার কোনো কথা মনে করবে না—তার পূর্বের সব (ছোট) গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।”
(বুখারি ১৫৯, মুসলিম ২২৬)
ফজিলত
- পূর্বের ছোট গুনাহ ধুয়ে দেয়
- ঈমানকে শক্তিশালী করে
- আল্লাহর কাছে নৈকট্য বৃদ্ধি করে
- যেসব আমল গুনাহ মাফ করে
৩. কাছরাতুস সুজূদ – বেশি বেশি সিজদা
রবীআ (রা) নবী ﷺ-কে বললেন, “আমি জান্নাতে আপনার সঙ্গ চাই।”
নবী ﷺ বললেন—
“তাহলে বেশি বেশি সিজদা করে আমাকে এতে সাহায্য কর।”
(মুসলিম ৪৮৯)
৪. তাহাজ্জুদ নামাজ – পাপ মোচনকারী
নবী ﷺ বলেছেন:
“তাহাজ্জুদ সালিহীনদের অভ্যাস, রবের নৈকট্যের মাধ্যম, গুনাহ মোচনকারী এবং গুনাহ থেকে বিরত রাখে।”
(তিরমিযী ৩৫৪৯)
সেরা সময়
- রাতের শেষ তৃতীয়াংশ
৫. মায়্যিতকে গোসল দেওয়া – গোপন রাখলে চল্লিশবার ক্ষমা
রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যে মায়্যিতকে গোসল দিবে এবং তার দোষ গোপন করবে, আল্লাহ চল্লিশবার তার গুনাহ মাফ করবেন।”
(বায়হাকী, মুসতাদরাক)
৬. বেশি বেশি দান-সদকা করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“সদকা গুনাহ নিভিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুন নেভায়।”
(তিরমিযী ৬১৪)
ফজিলত
- গুনাহ মোচন করে
- কষ্ট দূর করে
- রিজিক বৃদ্ধি করে
৭. আন্তরিক তওবা করা
আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর—আন্তরিক তওবা। সম্ভবত তোমাদের রব তোমাদের গুনাহ মাফ করবেন।”
(সূরা তাহরীম: ৮)
শর্ত
- গুনাহ ছেড়ে দেওয়া
- অতীতের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
- আর না করার দৃঢ় সংকল্প নেওয়া
৮. রমজানের রোজা রাখা
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।”
(বুখারি ৩৮, মুসলিম ৭৬০)
৯. লাইলাতুল কদরের ইবাদত করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।”
(বুখারি ৩৫, মুসলিম ৭৬০)
১০. মানুষের প্রতি অন্যায় ক্ষমা করা
আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
“ক্ষমা কর এবং এড়িয়ে যাও, আল্লাহ পছন্দ করেন সৎকর্মশীলদের।”
(সূরা আল-আরাফ: ১৯৯)
১১. কুরআন তিলাওয়াত করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি হরফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য একটি নেকি, আর প্রতিটি নেকি দশগুণ বৃদ্ধি পাবে।”
(তিরমিযী ২৯১০)
১২. সালামের প্রচলন করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“তোমরা একে অপরের মধ্যে সালাম প্রচলন কর, এতে পরস্পরের ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।”
(মুসলিম ৫৪)
১৩. অসুস্থদের খোঁজখবর নেওয়া
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি অসুস্থের খোঁজ নেয়, ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে।”
(তিরমিযী ৯৬৯)
১৪. নামাজের জন্য আজান দেওয়া
নবী ﷺ বলেছেন:
“মুয়াজ্জিনের আওয়াজ যেখানে পৌঁছায়, সেখানে যত জীব আছে, সবাই কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য দেবে।”
(বুখারি ৬০৯)
১৫. জুমার দিনে সূরা কাহফ পড়া
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি জুমার দিনে সূরা কাহফ পড়বে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যে নূর আলোকিত হবে।”
(হাকিম ২/৩৯৯)
১৬. ইস্তিগফার বেশি বেশি করা
আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
“তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, তারপর তাঁর দিকে ফিরে আসো।”
(সূরা হুদ: ৩)
১৭. পিতামাতার সেবা করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“পিতামাতার সন্তুষ্টি আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর পিতামাতার অসন্তুষ্টি আল্লাহর অসন্তুষ্টি।”
(তিরমিযী ১৮৯৯)
১৮. মসজিদ নির্মাণ বা রক্ষণাবেক্ষণ করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানিয়ে দেবেন।”
(বুখারি ৪৫০)
১৯. কবর জিয়ারত করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“তোমরা কবর জিয়ারত কর, এটি আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।”
(মুসলিম ৯৭৬)
২০. মানুষকে কষ্ট থেকে রক্ষা করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কারো কষ্ট দূর করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিনে তার কষ্ট দূর করবেন।”
(মুসলিম ২৬৯৯)
ফজিলত
- আল্লাহর ক্ষমা পাওয়া
- মানুষের সাথে সম্পর্ক উন্নতি
- অন্তরে প্রশান্তি
২১. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বেশি বেশি বলা
নবী ﷺ বলেছেন:
“সর্বোত্তম যিকির হলো — লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।”
(তিরমিযী ৩৩৮৩)
২২. অযথা কথা ও সময় নষ্ট থেকে বিরত থাকা
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি অপ্রয়োজনীয় কথা ত্যাগ করে, তার ইসলাম সুন্দর হয়ে যায়।”
(তিরমিযী ২৩১৭)
২৩. অন্যের গোপন বিষয় গোপন রাখা
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে মুসলিমের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।”
(মুসলিম ২৫৯০)
২৪. শিশুদের প্রতি দয়া করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
(তিরমিযী ১৯২০)
২৫. প্রাণীদের প্রতি দয়া করা
নবী ﷺ একটি মহিলার কাহিনি বলেছেন, যিনি বিড়ালকে না খাইয়ে মেরে ফেলেছিলেন—ফলে তিনি জাহান্নামে গিয়েছেন; আরেকজন কুকুরকে পানি খাওয়ানোর জন্য জান্নাতে গিয়েছেন।
(বুখারি ৩৩১৮)
২৬. ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো
আল্লাহ বলেন:
“তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মিসকিন, ইয়াতিম ও বন্দিকে খাবার খাওয়ায়।”
(সূরা আল-ইনসান: ৮)
২৭. সৎ পরামর্শ দেওয়া
নবী ﷺ বলেছেন:
“দ্বীন হলো নসীহত।”
(মুসলিম ৫৫)
২৮. বিবাদ মীমাংসা করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপন করা উত্তম।”
(তিরমিযী ২৫০৯)
২৯. দরিদ্রের ঋণ মওকুফ করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে দরিদ্রের ঋণ মওকুফ করে বা সময় দেয়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন।”
(মুসলিম ৩০০৬)
৩০. পানাহার বেঁচে গিয়ে পানি পান করানো
নবী ﷺ বলেছেন:
“মানুষকে পানি পান করানো সর্বোত্তম সদকা।”
(বুখারি ২২৩২)
৩১. কষ্টের সময় ধৈর্য ধরা
আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের জন্য সীমাহীন প্রতিদান রয়েছে।”
(সূরা আজ-জুমার: ১০)
৩২. উত্তম চরিত্র বজায় রাখা
নবী ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সে, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।”
(বুখারি ৬০৩৫)
৩৩. জ্ঞান অর্জন করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরজ।”
(ইবনে মাজাহ ২২৪)
৩৪. জ্ঞান বিতরণ করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে কুরআন শিখে এবং তা শিক্ষা দেয়।”
(বুখারি ৫০২৭)
৩৫. মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়া করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“যখন একজন মুসলিম তার ভাইয়ের জন্য অনুপস্থিতিতে দোয়া করে, ফেরেশতা বলে: তোমার জন্যও তেমন।”
(মুসলিম ২৭৩৩)
৩৬. কষ্টে থাকা মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া
নবী ﷺ বলেছেন:
“যে শোকার্তকে সান্ত্বনা দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে সম্মানিত করবেন।”
(তিরমিযী ১০৭৩)
৩৭. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা
আল্লাহ বলেন:
“ন্যায়ের ওপর দৃঢ় থাকো।”
(সূরা আন-নিসা: ১৩৫)
৩৮. মিথ্যা ত্যাগ করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“মিথ্যা থেকে দূরে থাকো, কারণ মিথ্যা ফাসাদের দিকে নিয়ে যায়।”
(বুখারি ৬০৯৪)
৩৯. গীবত থেকে বাঁচা
আল্লাহ বলেন:
“তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের গীবত না করে।”
(সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
৪০. আল্লাহর পথে জিহাদ করা
নবী ﷺ বলেছেন:
“আল্লাহর পথে জিহাদ সর্বোত্তম কাজ।”
(বুখারি ২৬)
উপসংহার
আমরা যদি জীবনে এই আমলগুলো করার চেষ্টা করি, তবে আল্লাহ তাআলার রহমতে গুনাহ মাফ হয়ে যাবে এবং আমাদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে যাবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন—আমীন।
FAQs
১. গুনাহ মাফের জন্য কোন আমল সবচেয়ে উত্তম?
বারবার হজ ও ওমরাহ, তাহাজ্জুদ নামাজ, বেশি বেশি সিজদা এবং তাহিয়্যাতুল ওযু।
২. হজ ও ওমরাহর সুযোগ না থাকলে কী করব?
অন্য নেক আমল যেমন তাহাজ্জুদ, নফল নামাজ, দান-সদকা বেশি করুন।
৩. তাহাজ্জুদের সেরা সময় কখন?
রাতের শেষ তৃতীয়াংশ।
৪. মায়্যিতকে গোসল দেওয়ার সময় কী কী মানতে হয়?
গোপন রাখা, সুন্দরভাবে গোসল দেওয়া, এবং হাদিসে বর্ণিত সুন্নত অনুসরণ।
৫. নফল নামাজ বেশি পড়ার উপকারিতা কী?
গুনাহ মাফ, মর্যাদা বৃদ্ধি, আল্লাহর নৈকট্য বৃদ্ধি।